ইন্টারভিউ – কী করবেন, কী করবেন না

ইন্টারভিউ প্রস্তুতি – কী করবেন, কী করবেন না ? যদি কেউ প্রথমবার ইন্টারভিউ দিতে যান তাহলে অনেকেই আড়ষ্টতা অনুভব করেন যা মনোবৈজ্ঞানিক দিক থেকে স্বাভাবিক। কিন্তু যদি আপনি কিছু গাইডলাইন মেনে চলেন তাহলে আপনার আড়ষ্টতা থাকবে না এবং তা আপনার সফলতার কারণ হতে পারে। আসুন দেখে নেওয়া যাক।

প্রথম কদম

ঘুম থেকে উঠেই শরীর ও মনকে আগে সতেজ করে নিন। মনের মধ্যে যেন কোনরকম টেনশন বা উদ্বেগ না থাকে। মনে রাখবেন উদ্বেগ বা চাপা টেনশন থাকলে আপনি বোর্ডের সামনে নিজেকে ঠিকমত মেলে ধরতে পারবেন না। মন তাজা রাখতে হালকা একটু প্রাণায়াম বা যোগাভ্যাস করে নিতেও পারেন।

ইন্টারভিউ সেণ্টারে আপনার উপস্থিতির সময় হিসেব করে অন্তত এক ঘণ্টা আগে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান।

বাড়ি থেকে এক্সাম সেন্টার যাবার সময় অবশ্যই ঐ দিনের দু তিনটি নিউজ পেপার পড়ে নিন। কাজে দিতে পারে।

যথা সময়ে এক্সাম সেন্টারে আপনার উপস্থিতি জানান দিন। আপনার চালচলন ও আচরণ এই সময় থেকেই মার্জিত ও ভদ্র হতে শুরু করুক।

এরপর নির্দেশমত অপেক্ষা করুন যথাস্থানে। অপেক্ষা করবেন, টেনসন নয়। আপনি ভাবতে থাকুন, আপনি অপেক্ষা করছেন আপনার সফলতার দোরগোড়ায়। একটা ধাপ শুধু পেরনো বাকি। মনে জাগুক দৃঢ় প্রত্যয় – “যদি আজ একজনও চূড়ান্ত পর্যায়ে সু্যোগ পায় তো সে আমি।”

নো টেনসন

আচ্ছা, ইন্টারভিউ বোর্ডে তো চলে এলেন, আপনার পোশাক কেমন হয়েছে বললেন না তো ? সাজগোজ ? পোশাক আপনার রূচি ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ করে। ইন্টারভিউ বোর্ডে যাতে আপনার এই দিকটির প্রকাশ ঘটে তার প্রতি আপনাকে নজর দিতে হবে। কেমন পোশাক পড়বেন। এক্ষেত্রে আমাদের পরামর্শ ছেলেরা সাদা বা হালকা রঙের জামা পড়তে পারেন। সঙ্গে কালো প্যান্ট হলে ভালো। মহিলাদের প্রয়োজন রূচিসম্মত শাড়ি। হাতে উভয়েই ঘড়ি ব্যবহার করবেন।

হাতে বা গলায় কোথাও কোন মাদুলি তাবিজ জাতীয় কিছু ব্যবহার করবেন না। অধিক মাত্রায় গহনা ব্যবহারও ঠিক হবে না। যাদের লিপষ্টিক লাগানোর অভ্যেস ঐ দিনটির জন্য না ব্যবহার করলেই ভালো। একান্তই করতে হলে অতি সামান্য এবং খুবই হালকা রঙের।

এরপর একসময় আপনার অপেক্ষার অবসান ঘটবে। ডাক পড়বে ভেতরে যাবার। ডাক শুনেই আপনার মনে প্রথমে একটা কোথাও চাপা টেনসন আসতে চাইবে। কিন্তু আপনি পাত্তা দেবেন না। কারণ আপনি সকালেই মনকে সতেজ রাখার সিদ্ধান্ত করে নিয়েছেন। তাছাড়া এতক্ষণ অপেক্ষা করতে করতে আর পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় আপনার মনে উঁকি দেওয়া টেনসন নিমেষেই উধাও হয়ে যাবার কথা। আপনি ভেতরে যাবার জন্য প্রস্তুত।

ভেতরে তো যাচ্ছেন, কিন্তু তার আগে অনুমতি নিয়েছেন কি ? ভেতরে ঢোকার আগে জিজ্ঞেস করে নিন – “আমি আসব / আসতে পারি স্যার ?” অনুমতি পেলে তবেই ঢুকবেন। অনেকেই সাধারণত ভেতরে ঢোকার অনুমতি পেয়েই চেয়ার টেনে বসে পড়েন। এমনটা করবেন না। এক্ষেত্রেও অনুমতি নিন। “বসতে পারি স্যার ?” অনুমতি পেলে “ধন্যবাদ” জানিয়ে বসুন। অথবা তাঁরা নিজে থেকে বসতে বললে বসুন এবং “ধন্যবাদ” জ্ঞাপন করুন।

আপনি চেয়ারে বসলেন। আপনার হাতে আছে ফাইল বা ব্যাগ। কোথায় রাখবেন ভাবছেন ? সামনের টেবিলে ? না। আপনার কোলেই রাখুন। টেবিলে রাখতে হলে ওনাদের অনুমতি নিন।

এরপর তাঁরা যা দেখতে চাইবেন মানে আপনার মার্কশিট বা অন্য কিছু যাই হোক অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে দেখান। সবকিছু হয়ে গেলে এবার প্রশ্নোত্তরের পালা।

প্রশ্নের মুখোমুখি

আপনাকে বিষয় সহ নানা প্রশ্ন করা হতে পারে। বিদ্যালয়, ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আপনার মনোভাব, শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার কারণ, শিক্ষা সংক্রান্ত সাম্প্রতিক কিছু ভাবনা বা ঘটনা, প্রিয় ব্যক্তি, হবি ইত্যাদি। সবই যে আপনি সঠিক উত্তর দিতে পারবেন এমন নয়। মনে রাখবেন ইন্টারভিউ আপনার জ্ঞানের পরিধি যাচাইয়ের জায়গা নয়। তা হয়ে গেছে লিখিত পরীক্ষায়। ইন্টারভিউতে তাই যাচাই হয় যা লিখিত পরীক্ষায় হয় না। আপনার ব্যক্তিত্ব। আপনি কতখানি উপযুক্ত শিক্ষকতার পেশায় তাই-ই বিচার করা হয় এখানে। এখন প্রশ্নোত্তর পর্বে আপনি কেমন আচরণ করবেন ?

উত্তর দিন সরাসরি প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়ে। এবং যিনি প্রশ্ন করছেন মূলত তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দেবেন। উত্তর দেবার সময় চেষ্টা করবেন যাতে আপনার দৃষ্টি উপস্থিত বাকী ইন্টারভিয়ারের প্রতি যায়। মানে আপনি প্রশ্নকর্তার সঙ্গে সঙ্গে বাকিদের দিকেও তাকানোর চেষ্টা করবেন। যদি তাঁরা আপনার উত্তরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন “ধন্যবাদ” জানাতে ভুলবেন না। উত্তর দেবার সময় নীচের দিকে, চেয়ার টেবিল দেওয়ালে তাকিয়ে উত্তর দেবেন না।

অনেকে প্রশ্ন শুনে এমন একটা ভাণ করেন, “ইস্‌ এই একটু আগেও জানতাম। এই মাত্র ভুলে গেলাম। পেটে আসছে মুখে আসছে না”। এমনটা করবেন না। না জানলে সরাসরি জানিয়ে দিন “আমি জানি না স্যার / ম্যাম, দুঃখিত।”

অনেক সময় ইন্টারভিউয়ার আপনার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিতে চান। তিনি আপনাকে এমন কথা বলতে পারেন বা আপনি সঠিক উত্তর দেওয়া স্বত্বেও ঠিক সন্তুষ্টি প্রকাশ নাও করতে পারেন। আপনি বিচলিত হবেন না, উত্তেজিত হবেন না।

আপনাকে যতটুকু প্রশ্ন করা হবে ততটুকুই উত্তর দিন। বেশি জ্ঞান দেখাতে গেলেই সমূহ বিপদে পড়তে পারেন।

আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় ইংরেজীতে আপনি উত্তর দেবেন ইংরেজীতেই। যদি বাংলায় প্রশ্ন করা হয় উত্তর দেবেন বাংলাতেই।

উত্তর দেবার সময় হাতে হাত ঘষা বা আঙুল ফোটানো কান চুলকানো জাতীয় কিছু করবেন না।

প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে তারাই আপনাকে জানিয়ে দেবেন। আপনাকে তাঁরা হয়তো বলবেন “আসুন” বা “এবার আসতে পারেন” জাতীয়। আপনি উপস্থিত সকলকে পুনরায় ধন্যবাদ জানিয়ে শান্ত ধীর ও মার্জিত ভঙ্গীতে বেরিয়ে আসবেন।

ধন্যবাদ। সকলকে আমার শুভেচ্ছা জানাই।
ছবি – প্রতীকী

লিখেছেন – নীলরতন চট্টোপাধ্যায়, বাংলা শিক্ষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *